রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৪

শ্মশান

কুহেলির হিমশয্যা অপসারি ধীরে
রূপময়ী তন্বী মাধবীরে
ধরণী বরিয়অ লয় বারে -বারে-বারে!
--আমাদের অশ্রুর পাথারে
ফুটে ওঠে সচকিতে উত্সবের হাসি,
অপরূপ বিলাসের বাঁশি!
ভগ্ন-প্রতিমারে মোরা জীবনের বেদীতটে আরবার গড়ি,
ওফনাময় সুরাপাত্র ধরি
ভুলে যাই বিষের আস্বাদ!
মোহময় যৌবনের সাধ
আতপ্ত করিয়া তোলে স্থবিরের তুহিন- অধর!
চির-মৃতু্যচর
হে মৌন শ্মশান,
ধূম -অবগুন্ঠনের অন্ধকারে আবরি বয়ান
হেরিতেছ কিসের স্বপন!
ক্ষনে ক্ষণে রক্তবহ্নি করি নিবাপন
স্ত্মব্ধ করি রাখিতেছ বিরহীর ক্রন্দনের ধ্বনি!
তব মুখ-পানে চেয়ে কবে বৈতরণী
হয়ে গেছে কলহীন!
 বক্ষে তব হিম হয়ে আছে কত উগ্রশিখা চিতা
হে অনাদি পিতা!
ভষ্মগর্ভে, --মরণের অকূল শিয়রে
জন্নযুগ দিতেছ প্রহরা,--
কবে বসুন্ধরা
মৃতু্যগাঢ় মদিরার শেষ পাত্রখানি
তুলে দেবে হস্ত্মে তব, -কবে লবে টানি
কন্কাল- অঙ্গুলি তুলি শ্যামা ধরণীরে
শ্নাশান -তিমিরন,
লোলুপ নয়ন মেলি হেরিবে তাহার বিবসনা শোভা
দিব্য মনোলোভা!
কোটি কোটি চিতা -ফণা দিয়া
রূপসীর অঙ্গ আলিঙ্গিয়া
শুষে নেবে সৌন্দর্যের তামরস-মধু!
এবমুধা-বধূ
আপনারে ডারি দেবে উরসে তোমার!
ধ্বক্ ধ্বক্  দারুণ তৃষ্ঞার
রসনা মেলিয়া--
অপেক্ষায় জেগে আছে শ্নাশানের হিয়া!
আরোকে-আধারে
অগণন চিতার দুয়ারে
যেতেছে সে ছুটে,
তৃপ্তিহীন তিক্ত বক্ষপুটে
আনিতেছে নব=মৃদ্যু-পথিকেরে ডাকি,
তুলিতেছে রক্ত-ধূম্র -আখি!
--নিরাশার দীঘ শ্বাস শুধু
বৈতরণীমরু ঘেরি জ্বলে যায় ধূ ধূ,
আসে না প্রেয়সী!
--নিদ্রাহীন শশী,
আকাশের অনাদি তারকা,
রহিয়াছে জেগে তার সনে ;
শ্নাশানের হিম বাতায়নে
শত শত প্রেতবধূ দিয়ে যায় দেখা,-
তবু সে যে পড়ে আছে একা,
বিমনা-বিরহী!
বক্ষে তার কত লক্ষ সভ্যতার স্মৃতি গেছে দহি,
কত শৌর্য -সাম্রাজ্যের সীমা
প্রেম-পুণ্য -পূজার গরিমা
অকলন্ক সৌন্দর্যের  বিভা
গৌরবের দিবা!
--তবু তার মেটে নাই তৃষা;
বিচ্ছেদের নিশা
অহো তার হয় নাই শেষ!
অশ্রান্ত্ম অঙ্গুলি সে যে করিছে নির্দেশ
অবনীর পক্ববিম্ব অ:রের পর !
পাতাঝরা হেমন্ত্মের স্বর
করে দেয় সচকিত তারে
মিানী-পাথারে
কুয়াশাপুরীর মৌ ন জালায়ন তুলে
চেয়ে থাকা অাঁধারে অকূলে
সুদূরের পানে|
বৈতরণীখেয়াঘাটে মরণ--সন্ধানে
এল কি রে জাহ্নবীর শেষ ঊর্মিধারা!
অপার শ্মশান জুড়ি জ্বলে লক্ষ চিতাবহ্নি, --কামনা-সাহারা!

বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৪

ডাহুকী

মালঞ্চে পুষ্পিতা লতা অবনতমুখী,--
নিদাঘের রৌদ্রতাপে একা সে ডাহুকী
বিজন-তরুর শাখে ডাকে ধীরে ধীরে
বনচ্ছায়া-অন্ত্মরালে তরল তিমিরে
--আকাশে মন্থর মেঘ, নিরালা দুপুর!
--নিস্ত্মব্ধ পল্লীর পথে কুহকের সুর
বাজিয়া উঠিছে আজ ক্ষণে ক্ষণে ক্ষণে!
সে কোন্ পিপাসা কোন্ ব্যাথা তার মনে
হারায়েছে wপ্রয়ারে কি ?--অসীম আকাশে
ঘুরেছে অনন্ত্ম কাল রীচিকা -আশে?
বাঞ্ছিত দেয়নি দেখা নিমেষের তরে!--
কবে কোন্ রুক্ষ কাল- বৈশাখীর ঝড়ে
ভেঙে গেছে নীড়, গেছে নিরুদ্দেশে ভাসি!
--নিঝুম বনের তটে বিমনা উদাসী
গেয়ে যায়; সুপ্ত পল্লী-তাটিনীর তীরে!--
ডাহুকীর প্রতিধ্বনি-ব্যথা যায় ফিরে|
পল্লবে নিস্ত্মব্ধ পিক,-- নীরব পাপিয়া,
গাহে একা নিদ্রাহারা বিরহিণী হিয়া!
আকাশে গোধূলি এল,-- দিক্ হল স্নান,
ফুরায়না তবু হায় হুতাশীর গান!
স্ত্মিমিত পল্লীরে তটে কাঁদে বারবার,
কোন্ যেন সুনিভূত রহস্যের দ্বার
উন্নক্ত হল না আর কোন্ সে গোপন
নিল না হৃদয়ে তুলি তার নিবেদন|

পতিতা

আগার তাজার বিভীষিকাভরা, --জীবন মরণময়!
সমাজের বুকে অভিশাপ সে যে,--সে যে ব্যাধি, --সে যে ক্ষয়;
প্রেমের পসরা ভেঙে ফেলে দিয়ে ছলনার কারাগার
রচিয়াছে সে যে,--দিনের আলোয় রুদ্ধ করেছে দ্বার!
সূর্যাকিরণ চকিতে নিভায়ে সাজিয়াছে নিশাচর,
কালনাগিনীর ফণার মতন নাচে সে বুকের পর!
চক্ষে তাজার কালকূট ঝরে,--বিষপস্কিল শ্বাস,
সারাটি জীবন মরীচিকা তার,--প্রহসন-পরিহাস!
ছোঁয়াচে তাহার স্লান হয়ে যায় শশীতারকার শিখা,
আলোকের পারে নেমে আসে তারে আঁধারের যবনিকা!
সে যে মন্বন্ত্মর,--মূতু্যর দ্যত,--অপঘাত,--মহামারী,--
মানুষ তবু সে,--তার চেয়ে বড়ো,--সে যে নারী, সে যে নারী!

নিখিল আমার ভাই

নিখিল আমার ভাই,
- -কীটের বুকেতে যেই ব্যাথা জাগে আমি সে বেদনা পাই;
যে প্রাণ গুমরি কাঁদিছে নিরালা শুনি যেন তার ধ্বনি,
কোন ফণী যেন আকাশ বাতাসে তোলেবিষ-গরজনি!
কি যেন যাতনা মাটির বুকেতে অনিবার ওঠে রণি,
আমার শস্য-র্স্বণপসরা নিমেষে হয় যে ছাই!
--সবার বুকের বেদনো আমার, নিখিল আমার ভাই|

আকাশ হতেছে কালো,
কাহাদের যেন ছায়াপাতে হায়, নিভে যায় রাঙা আলো!
বাতায়রে মোর জড়ায়ে কাতের বেদনার নাগপাশ,
বক্ষে আমার জাগিছে কাদের নিরাশা ,গ্লানিমা, ত্রাস,
--তাদের ব্যথার কুহেলি-পাথারে আকাশ হতেছে কালো|

লভিয়াছে বুঝি ঠাঁই
আমার চোখের অশ্রু পুঞ্জে নিখিলের বোন-ভাই|
আমার গানেতে জাগিছে তাদের বেদনা-পীড়ার দান,
আমার প্রাণেতে জাগিছে তাদের নিপীড়িত ভগবান,
আমার হৃদয়- যূপেতে তাহারা করিছে রক্তস্নান,
আমার মনের চিতানলে জ্বলে লটিায়ে যেতেছে ছাই!
আমার চোখের অশ্রুপুঞ্জে লভিয়াছে তারা ঠাঁই|

বিবেকানন্দ

জয়,--তরুণের জয়!
জয় পুরোহিত আহিতাগ্নিক,--জয়,---জয় চিণ্ময়!
স্পর্শে তোমার নিশা টুটেছিল,---উষা উঠেছিল জেগে
পূর্ব তোরণে, বাংলা-আকাশে,---অরুণ-রঙিন মেঘে;
আলোকে তোমার ভারত, এশিয়া,--জগত্ রেঙে|

হে যুবক মুসাফের,
স্থবিরের বুকে ধ্বনিলে শঙ্খ জাগরণপর্বের!
জিঞ্জির-বাঁধা ভীত চকিতেরে অভয় দানিলে আসি,
সুপ্তের বুকে বাজালে তোমার বিষাণ হে সন্ন্যাসী,
রুক্ষের বুকে বাজালে তোমার কালীয়-দমন বাঁশি!

আসিলে সব্যসাচী,
কোদণ্ডে তব নব উল্লাসে নাচিয়া উঠিল প্রাচী!
টন্কারে তব দিকে দিকে শুধু রণিয়া উঠিল জয়,
ডন্কা তোমার উীঠল বাজিয়া মাভৈঃ মন্ত্রময়;
শন্কাহরণ ওহে সৈনিক,---নাহিকো তোমার ক্ষয়!

তৃতীয় নয়ন তব
ম্লান বাসানার মনসিজ নাশি জ্বালাইত উত্সব!
কলুষ-পাতকে, ধূর্জটি, তব পিনাক উঠিত রুখে,
হানিতে আঘাতত দিবানিশি তুমি ক্লেদ-কামনার বুকে,
অসুর-আলয়ে শিব-সন্ন্যাসী বেড়াতে শঙ্খ ফুঁকে!

কৃষ্ঞচক্র সম
ক্লৈব্যের হুদে এসেছিলে তুমি ওগো পুরুষোত্তম,
এসেছিলে তুমি ভিখারীর দেশে ভিখারীর ধন মাগি
নেমেছিলে তুমি বাউলের দলে,---হে তরুণ বৈরাগী!
মর্মে তোমার বাজিত বেদনা আর্ত জীবের লাগি|

হে প্রেমিক মহাজন,
তোমার পানেতে তাকাইল কোটি দরিদ্র-নারায়ণ;
অনাথের বেশে ভগবান এসে তোমার তোরণতলে
বারবার যবে কেঁদে কেঁদে গেল কাতর আঁখির জলে,
অর্পিলে তব প্রীতি-উপায়ন প্রাণের কুসুমদলে!

কোথা পাপী? তাপী কোথা?
----ওােগ ধ্যানী, তুমি পতিত-পাবন যজ্ঞে সাজিলে হোতা!
শিব-সুন্দর-সত্যের লাগি শুরু করে দিলে হোম,
কোটি পঞ্চমা আতুরের তবে কাঁপায়ে তুলিলে ব্যোম,
মন্ত্রে তোমার বাজিল বিপুল শান্ত্মি স্বস্ত্মি ওঁ!

সোনার মুকুট ভেঙে
ললাট তোমার কাঁটার মুকুটে রাখিলে সাধক রেঙে!
স্বার্থ লালসা পাসরি ধরিলে আত্মাহুতির ডালি,
যজ্ঞের যূপে বুকের রুধির অনিবার দিলে ঢালি,
বিভাতি তোমার তাই তো অটুট রহিল অংশুমালী!

দরিয়ার দেশে নদী!
---বোধিসত্ত্বের আলয়ে তুমি গো নবীন শ্যামল ররোধি!
হিংসার রণে আসিলে পথিক প্রেম-খঞ্জর হাতে,
আসিলে করুণা-প্রদীপ হস্ত্মে হিংসার অমারামে,
ব্যাধি মন্বন্ত্মরে এলে তুমি সুধা-জলধির সংঘাতে!

মহামারী ক্রন্দন
ঘুচাইলে তুমি শীতল পরশে,---ওগো সুকোমল চন্দন!
বজ্র-কঠোর, কুসুম-মৃদুল,---আসিলে লোকোত্তর;
হানিলে কুলিশ কখনো,---ঢালিলে নির্মল নির্ঝর,
নাশিলে পাতক,--পাতকীরে তুমি অর্পিলে নির্ভর|

চক্র গদার সাথে
এনেছিলে তুমি শঙ্খ পদ্ম,---হে ঋষি, তোমার হাতে,
এনেছিলে তুমি ঝড় বিদু্যত্,---পেয়েছিলে তুমি সাম,
এনেছিলে তুমি রণ-বিপ্লব,---শান্ত্মি-কুসুম-দাম;
মাভৈঃ শঙ্খে জাগিছে তোমার নর-নারায়ণ-নাম!

জয়,--তরুণের জয়|
আত্মাহুতির রক্ত কখনো আঁধারে হয় না লয়!
তাপসের হাড় বজ্রের মতো বেজে উঠে বারবার!নাহি রে মরণে বিনাশ,--শ্মশানে নসাহw তার সংহার,
দেশে দেশে তার বীণা বাজে---বাজে কালে কালে ঝন্কার!

হিন্দু-মুসলমান
মহামৈত্রীর বরদ-তীর্থে---পুণ্য ভারতপুরে
পূজার ঘন্টা মিশিছে হরষে নামাজের সুরে সুরে!
আহ্নিক হেথা শুরু হয়ে যায় আজান বেলার মাঝে,
মুয়াজ্জেনের উদাস ধ্বনিটি গগনে গগনে বাজে;
জপে ঈদগাতে তসবী ফকির, পূজারী মন্ত্র পড়ে,
সন্ধ্যা-উষায় বেদবাণী যায় মিশে কোরানের স্বরে;
সন্ন্যাসী আর পীর
মিলে গেছে হেথা,--মিশে গেছে হেথা মসজিদ, মন্দির!

কে বলে হিন্দু বসিয়া রয়েছে একাকী ভারত জাঁকি?
---মুসলমানের হস্ত্মে হিন্দু বেঁধেছে মিলন-রাখী,
আরব শিমর তাতার তুর্কি ইরানের চেয়ে মোরা
ওগো ভারতের মোসলেমদল,--তোমাদের বুক-জোড়া!
ইন্দ্রপ্রস্থ ভেঙেছি আমরা,---আর্যাবর্ত ভাঙি
গড়েছি নিwখল নতুন ভারত নতুন স্বপনে রাঙি!
নবীন প্রাণে সাড়া
আকাশে তুলিয়া ছুটিছে মুক্ত যুক্তবেণীর ধারা!


রুমের চেয়রে ভারত তোমার আপন,---তোমার প্রাণ!
---হেথায় তোমার ধর্ম অর্থ,--হেথায় তোমার ত্রাণ;
হেথায় তোমার আসান ভাই গো, হোথায় তোমার আশা;
যুগ যুগ ধরি এই ধূলিতলে বাঁধিয়াছ  তুমি বাসা,
গড়িয়াছ ভাষা কল্পে কল্পে দরিয়ার তীরে বসি,
চক্ষে তোমার ভারতের আলো,---ভারতের রবি, শশী,
হে ভাই মুসলমান,
তোমাদের তরে কোল পেতে আছে ভারতে ভগবান!

এ ভারতভূমি নহেকো তোমার, নহেকো আমার একা,
হেথায় পড়েছে হিন্দুর ছাপ,---মুসলমানের রেখা;
---হিন্দু মনীষা জেগেছে এখানে আদিম উষার ক্ষণে,
ইন্দ্রদু্যম্নে উজ্জয়িনীতে মথুরা বৃন্দাবনে!
পাটলীপুত্র শ্রাবস্ত্মী কাশী কোলশ তক্ষশীলা
অজন্ত্মা আর নালন্দা তার রটিছে কীর্তিলীলা!
---ভারতী কমলাসীনা
কালের বুকেতে বাজায় তাহার নবপ্রতিভার বীণা!

এই ভারতের তখতে চড়িয়া শাহানশাহার দল
স্বপ্নের মণি-প্রদীপে গিয়েছে উজলি আকাশতল!
---গিয়েছে তাহারা কল্পলোকের মুক্তার মালা গাঁথি,
পরশে তাদের জেগেছে আরব্য-উপন্যাসের রাতি!
যমুনাজলের পুরানো বাঁশিতে বেজেছে নবীন সুর!
নতুন প্রেমের রাগে
তাজমহলের তরুণিমা আজো ঊষার অরুণে জাগে!

জেগেছে হেথায় আকবরী আইন,---কালের নিকষ কোলে
বারবার যার উজল সোনার পরশ উঠিছে জ্বলে!
সেলিম,--শাজাহাঁ,--চোখের জলেতে একশা করিয়া তারা
গড়েছে মিনার মহলা স্ত্মম্ভ কবর ও শাহদারা!
---ছড়ায়ে রয়েছে মোগল ভারত,---কোটি সমাধির স্তূপ
তাকায়ে রূেছে তন্দ্রাবিহীন,--অপলক অপরূপ|
--যেন মায়াবীর তুড়ি
স্বপনের ঘোরে স্ত্মব্ধ করিয়া রেখেছে কনকপুরী!

মোতিমহলের অযুত রাত্রি,--লকজ্ষ দীপের ভাতি
আজিও বুকের মেহেরাবে যেন জ্বালায়ে যেতেছে বাতি!
---আজিও অযুত বেগম-বাঁদীর শষ্পশয্যা ঘিরে
অতীত রাতের চঞ্চল চোখ চকিতে যেতেছে ফিরে!
দিকে দিকে আজো বেজে ওঠে কোন গজলঢ়ইলাহী গান!
পথ-হারা কোন ফকিরের তানে কেঁদে ওঠে সারা প্রাণ!
--নিখিল ভারতময়
মুসলমানের স্বপন-প্রেমের গরিমা জাগিয়া রয়!

এসেছিল যারা উষর মরুগিরিপথ বেয়ে,
একদা যাদের শিবিরে-সৈন্যে ভারত গেছিল ছেয়ে,
আজিকে তাহারা পড়শি মোদের, --মোদের বহিন-ভাই;
---আমাদের বুকে বক্স তাদের,---আমাদের কোলে ঠাঁই|
‘কাফের ‘যবন টুটিয়া গিয়াছে,---ছুটিয়া গিয়াছে ঘৃণা,
মোসলেম বিনা ভারত বিফল,--বিফল হিন্দু বিনা;
---মহামৈত্রীর গান
বাজিছে আকাশে নব ভারতে গরিমায় গরীয়াস!

দেশবন্ধু

বাংলার অঙ্গনেতে বাজায়েছ নটেশের রঙ্গমল্লী গাঁথা
অশান্ত্ম সন্ত্মান ওগো,--বিপ্লবিনী পদ্মা ছিল তব নদী--মাতা|
কালবৈশাখীর দোলা অনিবার দুলাইত রক্তপুঞ্চ তব
উত্তাল উর্মির তালে,---বক্ষে তব লক্ষ কোটি পন্নগ-উত্সব
উদ্যত ফণার নৃত্যে আস্ফালিত ধূর্জটির কণ্ঠ-নাগ জিনি,
ত্র্যম্বক-পিনাকে তব শন্কাকুল ছিল সদা শত্রু অক্ষৌহিণী|
স্পর্শে তব পুরোহিত, ক্লেদে প্রাণ নিমেষেতে উঠিত সঞ্চারি,
এসেছিলে বিষ্ঞুচক্র মর্মন্তুদ,--ক্লৈব্যের সংহারী|
ভেঙেছিলে বাঙালির সর্বনাশী সুষুপ্তির ঘোর,
ভেঙেছিলে ধূলিক্লিষ্ট শন্কিতের শৃঙ্খলের ডোর,
ভেঙেছিলে বিলাসের সুরাভাণ্ড তীব্র দর্পে,---বৈরাগের রাগে,
দাঁড়ালে সন্নাসী যবে প্রাচীমঞ্চে--পৃথ্বী-পুরোভাগে|
নবীন শাক্যের বেশে, কটাক্ষেতে কাম্য পরিহরি
ভাসিয়া চলিলে তুমি ভারতের ভাব-গঙ্গোত্তরী
আর্ত অস্পৃশ্যের তবে, পৃথিবীর পঞ্চমার লাগি;
বাদলের মন্দ্র সম মন্ত্র তব দিকে দিকে তুলিলে বৈরাগী|
এনেছিলে সঙ্গে করি অবিশ্রাম প্লাবনের দুন্দুভিনিনাদ,
শান্ত্মিপ্রিয় মুমূষূ©র শ্মশানেতে এনেছিলে আহব-সংবাদ,
গাণ্ডীবের টন্কারেতে মুহুমূ©হু বলেছিলে,---‘আছি, আমি আছি!
কল্পশেষে ভারতের কুরুক্ষেত্রে আসিয়াছি নব সব্যসাচী|
ছিলে তুমি দধীচির অস্থিময় বাসবের দম্ভোলির সম,
অলঙ্ঘ্য, অজেয়, ওগো লোকোত্তর, পুরষোত্তম|
অহিংসার তপোবনে তুমি ছিলে চক্রবতী© ক্ষত্রিয়ের সাজে,---
অক্ষয় কবচধারী শালপ্রাংশু রক্ষকের বেশে|
ফেরুকুল-সন্কুলিত উঞ্ছবৃত্তি ভিক্ষুকের দেশে
ছিলে তুমি সিংহশিশু, যোজনান্ত্ম বিহরি একাকী
স্ত্মব্ধ শিলাসন্ধিতলে ঘন ঘন গর্জনের প্রতিদ্ধনি মাখি|
ছিলে তুমি নীরবতা-নিষে্্পষিত নির্জীবের নিদ্রিত শিয়রে
উণ্মত্ত ঝটিকা সম, বহ্নিমান বিপ্লবের ঘোরে;
শক্তিশেল অপঘাতে দেশবক্ষে রোমাঞ্চিত বেদানার ধইন
ঘুচাতে আসিয়াছিলে মৃতু্যঞ্জয়ী বিশল্যকরণী|
ছিলে তুমি ভারতে অমাময় স্পন্দহীন বিহ্বল শ্মশানে
শব-সাধকের বেশে,--সঞ্জীবনী অমৃত সন্ধানে|
রণনে রঞ্চনে তব হে বাউল, মন্ত্রমুগ্ধ ভারত, ভারতী;
কলাবিত্ সম হায় তুমি শুধু দগ্ধ হলে দেশ-অধিপতি|
বিধিবশে দূরাগত বন্ধু আজ, ভেঙে গেছে বসুধা-নিমোক,
অন্ধকার দিবাভাগ বাজে তাই কাজরীর শ্লোক|
মল্লারে কাঁদিছে আজ বিমানের বৃন্ত্মহারা মেঘছত্রীদল,
গিরিতটে, ভূমিগর্ভ ছায়াচ্ছন্ন,--উচ্ছ্বাসউচ্ছল|
যৌবনের জলরঙ্গ এসেছিল ঘনস্বনে দরিয়ার দেশে,
তৃষ্ঞাপাংশু অধরেতে এসেছিল ভোগবতী ধারার আশ্লেষে|
অর্চনার হোমকুণ্ডে হবি সম প্রাণবিন্দু বারংবার ঢালি,
বামদেবতার পদে অকাতরে দিয়ে গেল মেধ্য হিয়া ডালি|
গৌরকান্ত্মি শন্করের অম্বিকার বেদীতলে একা
চুপে চুপে রেখে এল পুঞ্জীভূত রক্তস্রোত-রেখা|

সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৪

সিন্ধু

বুকে তব সুর-পরী বিরহঢ়বিধূর
                গেয়ে যায়, হে জলধি, মায়ার মুকুর!
কোন্ দূর আকশের ময়ূর-নীলিমা
                তোমারে উতলা করে! বালুচর সীমা
উল্লঙ্ঘি তুলিছ তাই শিরোপা তোমার,---
                উচ্ছৃঙ্খল অট্টহাসি,---তরঙ্গের বাঁকা তলোয়ার!
গলে মৃগতৃষ্ঞাুবিষ, মারীর আগল
                তোমার সুরার স্পর্শে আশেক-পাগল!
উদ্যত উর্মির বুকে অরৃপের ছবি
                নিত্যকাল বwহছক হে মরমিয়া কবি
হেদুন্দুভি দুর্জয়ের, দূরন্ত্ম অগাধ!
                পেয়েছি শক্তির তৃপ্তি বিজয়ের স্বাদ
                তোমার উলঙ্গনীল তরঙ্গের গানে!
কালে কালে দেশে দেশে মানুষ-সন্ত্মানে
                তুমি শিখায়েছ বন্ধু দুর্মদ-দূরাশা!
আমাদের বুকে তুমি জাগালে পিপাসা
                দুশ্চর তটের লাগি --সুদূরের তরে|
রহস্যের মায়াসৌধ বক্ষের উপরে
                ধরেছ দুস্ত্মর কাল;--তুচ্ছ অভিলাষ,
দুদিনের আশা, শান্ত্মি, আকাঙ্খা, উল্লাস,
পলকে দৈন্য -জ্বালা-জয়-পরাজয়,
                ত্রাস-ব্যথাজাসি-অশ্রু-তপস্যা-সঞ্চয়,--
পিনাকশিখায় তব হ,ল ছারখার|
ইচ্ছার বাড়বকুণ্ডে,উগ্র পিপাসার
                ধূ ধূ ধূ ধ বেদীতটে আপনারে দিতেছ আহুতি|
মোরক্ষুধা-দেবতারে তুমি করো স্তুতি!
                নিত্য নব বাসনার হলাহলে রাঙি
‘পারীয়ার প্রাণ লয়ে আছি মোরা জাগি
                বসুধার বাঞ্ছাকূপে, উঞ্ছের অঙ্গনে!
নিমেষের খেদ-হর্ষ-বিষাদের সনে
                বীভত্‌স খঞ্জের মতো করি মাতামাতি!
                চুরমার হয়ে যায় বেলোয়ারি বাতি!
ক্ষুরধার আকা•ক্ষার অগ্নি দিয়া চিতা
                গড়ি তবুবারবার--বারবার ধুতুরার তিতা
নিঃস্ব নীল ওষ্ঠ তুলি নিতেছি চুমিয়া!
                -মোর বক্ষকপোতের কপোতিনী প্রিয়া
কোথা কবে উড়ে গেছে,--পড়ে আছে আহা
                নষ্ট নীড়,--ঝরা পাতা, --পূবালির হাহা!
কাঁদে বুকে মরা নদী,-শীতের কুয়াশা!
                ওহে সিন্ধু, আসিয়াছি আমি সর্বনাশা
ভুখারী ভিখারী একা, আসন্ন- বিবশ!
                --চাহি না পলার মালা, শুক্তির কলস,
মুক্তাতোরণের তট মীনকুমারীর,
চাহি নানিতল নীড় বারুণীরাণীর!
                মোর ক্ষুধা উগ্র আরো, অলঙ্ঘ্য অপার!
একদিন কুকুরের মতো হাহাকার
                তুলেছিনু ফোঁটা ফোঁটা রুধিরের লাগি!
একদিন মুখখানা উঠেছিল রাঙি
                ক্লেদবসাপিন্ড চুমি রিক্ত বাসনার!
মোরে ঘিরে কেঁদেছিল কুহেলি আঁধার,---
                শ্মশানফেরেুর পাল,---শিশিরের নিশা,
                আলেয়ার ভিজা মাঠে ভুলেছিনু দিশা|
আমার হ্রদয়পীঠে মোর ভগবান
                বেদনার পিরামিড পাহাড়প্রমাণ
গেঁথে গেছে গরলের পাত্র চুমুকিয়া;
রুদ্র তরবার তব উঠুক নাচিয়া
                উচ্ছিষ্টের কলেজায়, অশিব -স্বপনে,
হে জলধি, শব্দভেদী উগ্র আস্ফালনে!
--পূজাথালা হাতে লয়ে আসিয়াচে কত পান্থ, কত পথবালা
সহর্য়ে সমুধ্যতীরে; বুকে যার বিষ-মাখা শায়কের জ্বালা
                সে শুধু এসেছে বন্ধু চুপে চুপে একা|
                অন্ধকারে একবার দুজনার দেখা!
                                বৈশাখের বেলাতটে সমুদ্রের স্বর,---
                অনন্ত্ম, অভঙ্গ, আনন্দসুন্দর!
                                তারপর, দূরপথে অভিযান বাহি

                চলে যাব জীবনের জয়গান গাহি|
The text publised in this blog is written by Jibanananda Das. Jibanananda Das (Bengali: জীবনানন্দ দাশ, /dʒɪbɒnʌnɒndɔː dʌʃ/) (17 February 1899 – 22 October 1954) was a Bengali poet, writer, novelist and essayist. Due to copyright law of Bangladesh and India His works are available under public domain from 2014 after 60 years of his death. Me being an admirer of his work, took the liberty to type and publish this text online. This text is not proof read and not complete. In case of any dispute please contact me snewaj at gmail dot com.